আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে নতুন জীবনের পথে মেধাবী স্কুলছাত্রী রিয়া

0
211
পাবনা প্রতিনিধি : অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী রিয়া খাতুন (১২)। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্রী হওয়ায় ক্লাসে সবসময় তার রোল নাম্বার এক। ৫ম শ্রেনীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেছিল সে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
এই বয়সে বসতে হয় বিয়ের পিড়িতে। ৪২ বছর বয়সী বিবাহিত এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে মেনে নিতে না পেরে সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যার। কিন্তু তাকে সে পথ থেকে ফেরায় তার সহপাঠি বান্ধবীরা। এরপর স্কুলশিক্ষকের মাধ্যমে আইনী সহায়তা চায় ইউএনও’র কাছে। সেখান থেকে তার স্থান হয় নতুন অভিভাবক ও নতুন ঠিকানা স্থানীয় পৌর মেয়রের কাছে। বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে এক নতুন জীবনের পথে পা বাড়ায় রিয়া। গত বৃহস্পতিবার (৩ মে) এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে পাবনার সুজানগরে। রিয়া সুজানগর উপজেলার চিনাখড়া উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের ছাত্রী।
পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, ৪ বছর বয়সে এক সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় রিয়া খাতুনের বাবা রেজাউল করিম। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দাদার বাড়ি থেকে তার নানার বাড়ি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের বেথুরিয়া গ্রামে আশ্রয় নেয় রিয়া ও তার মা মরিয়ম খাতুন। কিছুদিন পর তার মায়ের বিয়ে হয় একই উপজেলার ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়নের খালাইভেড়া গ্রামের মাবুদ আলী নামক এক ব্যক্তির সাথে। দরিদ্র নানার বাড়িতে থেকেই অনেক কষ্টে লেখাপড়া করতে থাকে রিয়া।
এর মধ্যে হঠাৎ করে সম্প্রতি রিয়ার সৎ বাবা ও মা নানার বাড়ি গিয়ে বেড়ানোর কথা বলে রিয়াকে নিয়ে যায় তারা। গত দুই মাস আগে রিয়াকে জোড়পূর্বক সুজানগর উপজেলার রাণীনগর ইউনিয়নের শারীরভিটা গ্রামের ৪২ বছর বয়সী নাছির হোসেন নামের এক বিবাহিত ব্যক্তির সাথে দেড় লাখ টাকা দেনমহরে বিয়ে দেয় সৎ বাবা ও মা। কিন্ত অল্প বয়সে মতের বিরুদ্ধে জোড়পূর্বক বিয়ে দিলেও রিয়া কোনমতেই তার স্বামীর বাড়িতে যেতে রাজি না হওয়ায় তাকে আর নিতে পারেনা শ্বশুড় বাড়ির লোকজন। তখন বর পক্ষ চলে যাওয়ার পর রিয়া আবার তার নানার বাড়িতে চলে যায়। এরপর থেকে মেয়েটির সৎ বাবা ও মা প্রায় প্রতিদিন রিয়ার নানার বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর করতো তার স্বামীর বাড়ি যাওয়ার জন্য।
আলাপকালে রিয়া জানায়, ‘এমন পরিস্থিতিতে আমার উপর নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেই এবং মৃত্যুর পর এর জন্য সৎ বাবা ও মা দায়ী-এমন কথা উল্লেখ করে একটি চিঠি লিখে একটি বইয়ের মধ্যে রেখে দেই। কয়েকদিন স্কুলে না যাওয়ায় আমার কয়েকজন সহপাঠি আমার খবর নিতে গত বৃহস্পতিবার (৩ মে)  আমার কাছে আসে। তখন আমি বান্ধবীদের কাছে সব ঘটনা খুলে বলে বলি। তখন বান্ধবীরা আমার নানীকে বলে ‘স্যাররা রিয়াকে দেখা করতে বলেছে’ জানিয়ে আমাকে নিয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শরিফুল ইসলামের কাছে নিয়ে গেলে আমি সব কথা স্যারকে জানাই।’
সহকারী শিক্ষক শরিফুল ইসলাম জানান, আমি সব কথা শোনার পর প্রথমে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম শাহজাহানকে জানাই। তিনি তখন সুজানগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুজিৎ দেবনাথ কে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করেন। ইউএনও রিয়াকে নিয়ে তার অফিসে যেতে বললে ইউপি চেয়ারম্যান রিয়া সহ আমাদের ইউএনও অফিসে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে যাওয়ার পর রিয়ার কাছে বিস্তারিত ঘটনা শোনেন ইউএনও স্যার।’
এরপর ইউএনও রিয়ার কাছে কি হয়েছে জানতে চাইতেই সে কন্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এ সময় রিয়া জানায়, ”নাছির নামক একজন মধ্যবয়সী বিবাহিত ব্যক্তির কাছ থেকে তার সৎ বাবা ও মা একটি নছিমন গাড়ি নিয়ে ঐ ব্যক্তির  সাথে আমার জোড়পূবর্ক বিয়ে দিয়েছে। কিন্ত আমি সেই বিয়ে মেনে না নেওয়ায় প্রতিদিন আমাকে মারধর করে। কিন্ত স্যার আমি পড়াশুনা করতে চাই, আমি আর আমার নানা বাড়িতে যাবোনা, আমাকে পড়াশুনার সুযোগ করে দেন স্যার।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিৎ দেবনাথ জানান, বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের রোকন, পৌর মেয়র আব্দুল ওহাব, পাবনা সহকারী পুলিশ সুপার (সুজানগর সার্কেল) ফরহাদ হোসেন, ওসি শরিফুর আলম, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে অবগত করে তাদের নিয়ে বসে আলোচনা করি। সেইসাথে মেয়েটির সৎ বাবা ও তার মাকে স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অফিসে ডেকে আনা হয়। তখন রিয়ার সৎ বাবা ও মার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বললে তারা তাদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তারা বলেন, উপস্থিত যদি কেউ রিয়াকে নিয়ে পড়াশুনা করিয়ে মানুষের মত মানুষ করতে চায় এবং রিয়াও যদি সেখানে থাকতে চায় সে ক্ষেত্রে তাদের কোন আপত্তি থাকবেনা।
এ সময় উপস্থিত প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে পৌর মেয়র আলহাজ¦ আব্দুল ওহাব বলেন, মেয়েটি যদি থাকতে চায় এবং তার সৎ বাবা ও মা সহ উপস্থিত সকলে যদি সম্মতি দেয় তাহলে এতিম ও মেধাবী স্কুলছাত্রী রিয়ার অভিভাবক হিসাবে দায়িত্ব নিতে চাই। তখন রিয়াও মেয়রের বাড়িতে থাকতে সম্মতি জানায়। এ সময় উপস্থিত সকলে মিলে মেধাবী স্কুলছাত্রী রিয়াকে তার নতুন অভিভাবক হিসাবে পৌর মেয়র আলহাজ¦ আব্দুল ওহাবের হাতে তুলে দেন।
এ বিষয়ে সুজানগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শরিফুল ইসলাম বলেন, রিয়া এখনও বিয়ের উপযুক্ত নয়। ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত সে আলাদা থাকবে। আর যার সাথে বিয়ে হয়েছিল সেই বিয়ের স্বপক্ষে কোনো প্রমানযোগ্য কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। মেয়েটিও তার সৎ-বাবা মায়ের কাছে যেতে রাজী নয়। তাই মেয়র আব্দুল ওহাব রিয়ার অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছেন।
সুজানগর পৌর মেয়র আব্দুল ওহাব বলেন, রিয়া মেধাবী ছাত্রী। তার সৎ বাবা-মা টাকার লোভে মেয়েটির জীবন নষ্ট করতে যাচ্ছিল। যা খুবই বেদনাদায়ক। রিয়াকে পড়াশোনা করাতে পারলে ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। সে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায়না। তাই মানুষ হিসেবে আরেকজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সামাজিক দায়িত্ব তার অংশ হিসেবে আমি রিয়ার অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছি।
এক প্রতিক্রিয়ায় রিয়া জানায়, সৎ বাবা-মায়ের অত্যাচার থেকে বাঁচতে পারছি, নতুন অভিভাবক পেয়েছি, খুব ভাল লাগছে। আমি লেখাপড়া করে মানুষ হতে চাই। ইউএনও স্যার, মেয়র সাহেব, স্কুলের শিক্ষক ও বান্ধবীদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। নতুন জীবনে নতুন করে পথ চলতে চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here